রোদ্দুরের কথকতা- দোল-পলাশের পদাবলী

সময় বদলায়। বদলাবেই। নিয়নের আলো ফিকে হয়ে এলইডি'র উজ্জলতায়। স্মার্টফোন মাপে রক্তচাপ। মুহূর্তগুলো বন্দি আজ আঙুলের ছোঁয়ায়। তবু ছুটির দিনে ক্লান্ত দুপুরে ভাতঘুম মন। শিরিষ গাছের দীর্ঘ ছায়া আড়মোড়া ভাঙে তপ্ত ছাদে। আর মন কেমন করা রবিবার দুপুরে মজে থাকে 'রোদ্দুরের কথকতা'। 

কলমে-দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়


মরা যারা সর্বত্র রঙ দেখি তাদের খুব আনন্দ। চতুর্দিকে রামধনু। ‘বেনিয়াসহকলা’ খেলে বেড়াচ্ছে। কখনো সাদা কখনো কালো। কখনো আলো কখনো ভালো। ছোটবেলাটা মোটামুটি সবুজের উপরই কেটেছে। বাবা ও মাস্টারমশাইরা পেছনের চামড়া লাল করে দিলেও অল্প কালশিটে আর লালের মধ্যেই ব্যাপারটা সীমাবদ্ধ ছিল। দুম করে প্রেমে পড়ে গেলেও দেখেছি মনের মধ্যে রঙিন বুদবুদ উঠত। সেগুলো অনেক দিন অব্দি থাকত। লাফাত, ঝাঁপাত। কিছুদিন পর টুক করে ফেটে যেত। তখন অল্প কয়েকদিন ধূসর দুনিয়ায়  ধূ ধূ মরুভূমি। ব্যাস, আবার যে কে সেই। 
সকাল বেলার রোদ্দুর কোথা থেকে উড়ে এল- ‘নীল নীল সবুজের ছোঁয়া কিনা তা বুঝি না, ছোট বড় হরেক রকম কম বেশি নীল। তারি মাঝে শুণ্যের আনমনা হাসির সামিল কটা গাংচিল।' ঐ সময়ে প্রেমের অনার্স পেপারটা বুদ্ধদেব গুহই পড়াতেন। ‘সুদেষ্ণা’ ‘নীলাঞ্জনা’ আর ‘বনলতা সেন’ নিয়ে জেরবার। ‘প্রিয়বন্ধু’ বারবার শুনিয়ে দিচ্ছে ভালবাসা মানে আর্চি’জ গ্যালারী আর ধোঁয়া ছাড়ার প্রতিশ্রুতি। অক্ষয় কুমার তখন হিরো। আমার প্যাংলা চেহারাতেও অলৌকিক ক্ষমতা জোগানোর দায়িত্বে ছিলেন। তুলতুলদের পালুই এর তলায় অক্ষয় কুমার-এর ছবিগুলো উই- য়ে  খেয়ে না দিলে আজও দেখাতে পারতাম। সেই সব হাসিরাশি, খুশিখুশি কথামালা হয়ে কবে উড়ে গেছে। 
আনমনে হাঁটা, নিজে নিজে হাসা, বৃষ্টিতে হাপুসুটি ভেজা, গলা জড়াজড়ি খুনসুটি, ‘রোদেলা দুপুরে মধ্য পুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার’। এমন কালারফুল ক্যাডাভেরাস ব্যাপারসাপার আর কবে কোথায় পাবো গুপীদা। আমাদের তখন কিছুই নাকি নেই। যতসব প্রিমিটিভ ওয়ার্ল্ড। ছোটা ভীম নেই।ডোরেমন নেই। মোবাইল নেই। কম্পিউটার নেই। ফ্রি কল নেই। আনলিমিটেড ডাটা নেই। কিন্তু সজনে ও নাজনে ছিল। উফ সজনে ফুলের বাটি চচ্চড়ি ছিল। পুকুরে ছিপ বাগিয়ে মাছ ধরা ছিল। দু চারটে ফড়িঙের পিছনে ছুটতে ছুটতে একটা গোটা দুপুর কাটিয়ে দেওয়া ছিল। জোড়া শিবতলায় সকাল বিকেল পাড়া ক্রিকেট ছিল। পছন্দসই মানুষ রাস্তা দিয়ে গেলে কেরামতি দেখানোর রেওয়াজ ছিল। বেলগাছে বেম্মদত্যি ছিল। তেনাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যেত এই সেদিনও। এখন স্ট্রীট লাইটের রমরমায় চোরডাকাত আটকানো না গেলেও তেনাদের বাজারটা পড়ে গেল। 
আমাদের পাড়ার অপুদা দোল ও সঙ্গীত দুটোতেই পারদর্শী ছিলেন। সমস্ত উপকরণ ও দোলের সরঞ্জাম জোগাড় করে বিরাট যৌথ পরিবারের বড়কর্তার মতো অভিজাত রঙ খেলাটা ওঁর কাছেই শেখা। সেই তুলনায় শান্তিনিকেতন ও পরে নস্যি লেগেছে। সেই রঙ তোলার জন্য আবার তালপুকুরে বা যমুনা দিঘিতে তোলপাড় করা সাঁতার। সেই প্রথম পেতলের পিচকারি দেখা। পাপাইদার কাছে। সেই দাদা সর্বদাই রবীন্দ্র সংগীত শুনতেন। ক্যাসেটের কি বাহার। জুলজুল করে তাকিয়ে থাকতাম সেই সব রঙিন দুনিয়ার দিকে। রঙের কখনও অভাব এই জীবনে হয়নি। বন্ধু বান্ধবীরাই অতীত বর্তমান ভবিষ্যত আলো করে দিয়েছে। জীবন রথের সারথির হাতেও অনেকটা আবীর থাকে। ইচ্ছে মতো উড়িয়ে দেবার জন্য। ধুলোখেলার জন্য। পা টিপে টিপে হাঁটলে ঐ উড়ন্ত সোনার কণা ছোঁয়া যায় না। শুনেছি আজও বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণ দোল খেলেন। কে জানে। তবে ভারতের ভাগ্যাকাশে সিদুঁরে মেঘ। প্রার্থনা করি মুখমিষ্টি হোক। সবার মুখের হাসি চওড়া হোক। চরাচর ভেসে যাক জ্যোৎস্নায়। দোল পূর্ণিমায় পূর্ণ চাঁদ ধুয়ে দিক অন্তর ও বাইরের সব মালিন্য মেঘ। আস্থা ভরসা আর বিশ্বাস ফিরে আসুক মানুষের উপর। মানবতার জয় হোক। সর্ব ধর্মে সর্ব জাতিতে সম্প্রীতির বাতাবরণ ফিরে আসুক।। 

1/Post a Comment/Comments

Unknown বলেছেন…

আসছে দোল যাচ্ছে দোল।
লেখা টা খুব সুন্দর হয়েছে দেবব্রত দা।
নবীনতর পূর্বতন